দেশ, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান

দেশ, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব মকবুল আহমাদ আজ ২৯ আগষ্ট নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেছেনঃ-

“মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ আজ এক মহাসংকটে নিপতিত। দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান, বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা চরম হুমকির সম্মুখীন। ক্ষমতায় টিকে থাকার নেশায় আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ও বিচার বিভাগকে ধ্বংসের গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য হচ্ছে যেনতেনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা। এ উদ্দেশ্যে তারা আদালতের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে।
অথচ দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন।
আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি আদায়ের জন্য ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। এখন আওয়ামী জোট সরকার সকলের মতামত অগ্রাহ্য করে পুনরায় ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। এর ফলে শুরু হয়েছে এক মহাসংকট। আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজন করলে জনগণ সেই নির্বাচন বয়কট করে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে আওয়ামী লীগ নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। উপজেলা নির্বাচন, সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, পৌরসভার নির্বাচনসহ দেশে যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে নির্বাচনের নামে মূলত: আওয়ামী লীগ প্রার্থীদেরকে ক্ষমতায় বসানোর ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আজ দেশে কোন নির্বাচনী পদ্ধতি নেই। নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে দেশের মালিক জনগণ। অথচ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রশক্তির অপব্যবহার করে জনগণের সকল অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কোথাও শান্তিপূর্ণ মিছিল বের হলে সেখানে গুলি চালানো হচ্ছে। বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদেরকে গুম ও হত্যা করা হচ্ছে। দলীয় ক্যাডারদের দ্বারা হামলা করে মামলা দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করা হচ্ছে। দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই, মৌলিক মানবাধিকার ভুলুন্ঠিত, সত্য কথা উচ্চারণ করলেই তাকে খুন বা গুম করা হচ্ছে। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলতে কিছু নেই। প্রতিদিন অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। হত্যা করে যেখানে সেখানে লাশ ফেলে রাখা হচ্ছে। বিচার বহির্ভূত হত্যা সরকারের রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

দেশে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অতি সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালত সর্বসম্মত রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে সংবিধান, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ দেশের সার্বিক বিষয়ে তাদের অভিমত তুলে ধরেন। আদালত আমিত্বও দলগত প্রাধান্য অর্জনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কড়া সমালোচনা করে তা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে মত দেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। আদালত জাতীয় সংসদের শতকরা ৭০ ভাগ সদস্য ব্যবসায়ী ও সংসদ অপরিপক্ক বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন। আদালত সুষ্ঠু গণতন্ত্রের জন্য নিরপেক্ষ ও গ্রহযোগ্য নির্বাচনের উপর গুরুত্বারোপ করে কতিপয় সুপারিশ তুলে ধরেন। প্রসঙ্গতঃ পরপর দুটো নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার ব্যাপারে অত্র আদালতের পূর্বের রায়ে তাদের পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেন। সর্বোচ্চ আদালতের এ রায় ও পর্যবেক্ষণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দেশে এক ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতা, এমপি ও মন্ত্রীগণ প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতিসহ বিচারকদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ও উস্কানীমূলক বক্তব্য রাখছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ২১ আগষ্ট তার প্রদত্ত বক্তব্যে সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে যে কুরুচিপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক বক্তব্য রেখেছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বলেন।
সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। সরকারের কোন কোন মন্ত্রী প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিচারপতির বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাত করে রায়ের ব্যাপারে তাদের দলীয় অবস্থান ব্যক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট বঙ্গভবনে প্রধান বিচারপতিকে ডেকে নিয়ে আইনমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তার উপর চাপ সৃষ্টি করেন। সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা রায়ের বিষয়ে আলোচনা করতে প্রধান বিচারপতির সাথে সাক্ষাত করেছেন মর্মে গণমাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়েছে। আওয়ামী আইনজীবীগণ সমাবেশ ডেকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন। তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আলটিমেটাম দেন।

দেশের আদালত ইতোপূর্বে বহু মামলার রায় দিয়েছেন। আওয়ামী সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় আদালতের রায়ের ভিত্তিতে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরসহ ৫ জন শীর্ষ নেতার ও দেশের প্রধান বিরোধী দলের একজন নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ বিতর্কিত বিচার ও রায়ে অনেক অসঙ্গতি থাকার পরও সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কেউ কোন প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করেনি। অন্যায়ভাবে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে ফাঁসি দেওয়ার নেপথ্যের ইতিহাস একদিন জাতির সামনে উন্মেচিত হবেই। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগ তাদের আজ্ঞাবহ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যার জন্য তারা প্রকাশ্যে আদালতের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশবাসী ভুলে যায়নি আওয়ামী লীগের পুরনো অভ্যাসের কথা।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শাসনকালে তদানীন্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে আদালতের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করা হয়। আওয়ামী লীগ প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাংচুর ও বিচারপতির কক্ষের দরজায় লাথি মারার ঘটনা ঘটিয়ে দিল। বর্তমানে আদালতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আক্রমণাত্মক ভূমিকার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিচার বিভাগকে ধ্বংস করা।
আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। জনগণ উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে যে, আওয়ামী লীগ দেশের বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ধ্বংস করার চূড়ান্ত খেলায় মেতে উঠেছে। দেশবাসীর কাছে এটা স্পষ্ট যে, এ সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোন নৈতিক অধিকার নেই। এ সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ নয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনকে ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু ক্ষমতার মোহ তার ঘোষণা বাস্তবায়ন করা থেকে তাকে বিরত রাখে। সরকার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
এমতাবস্থায়- দেশ, জাতি, রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার জন্য আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।”

No comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *